অর্থনৈতিক চাপ সামলে ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে নিতে সক্ষম রাশিয়া?

রাশিয়ায় অর্থনৈতিক সংকট বাড়ছে ধীরে ধীরে। এর প্রধান কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিভিন্নমুখী নিষেধাজ্ঞা।

রাশিয়ায় অর্থনৈতিক সংকট বাড়ছে ধীরে ধীরে। এর প্রধান কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিভিন্নমুখী নিষেধাজ্ঞা। তা সত্ত্বেও ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধে অর্থায়নে দেশটি এখনই বড় কোনো সংকটে পড়বে না বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ। বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় মস্কো আরো কয়েক বছর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম বলে অভিমত তাদের।

ইউরোনিউজের এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, রাশিয়ার অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে বর্তমানে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে সামরিক ব্যয়। তবে অর্থনীতিতে এর প্রভাব স্বল্পমেয়াদি। বরং এভাবে চলত থাকলে রাশিয়ার অর্থনীতি ধীরে ধীরে মন্দার দিকে এগোবে।

গত মাসে রাশিয়ার মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৮ শতাংশে, যা দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যের দ্বিগুণ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে রাশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ, যা চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) ১ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে।

উচ্চ সুদহার ও শ্রমিক সংকট রুশ অর্থনীতিকে আরো শ্লথ করে দিয়েছে। কমছে ব্যবসায়িক আস্থাও। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রাশিয়া কম্পোজিট পিএমআই অনুসারে চার মাস ধরে দেশটির বেসরকারি খাতের কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে।

ইউরোপভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর অ্যানালাইসিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিস ইন ইউরোপের (সিএএসই) অর্থনীতিবিদ ভ্লাদিস্লাভ ইনোজেমৎসেভ বলেন, ‘অর্থনৈতিক মন্দা এখন আর রাশিয়ার জন্য রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে না। কারণ দেশটির সরকার ও সমাজ দুটোই এ অভিঘাত সহ্য করার মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে।’

তার বিশ্লেষণ অনুসারে আগামী মাসগুলোয় দেশটিতে মৃদু মন্দা দেখা দিতে পারে। তবে এটি যুদ্ধের অর্থায়নে কোনো বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন আক্রমণ করে রাশিয়া। ওই সময় থেকে দফায় দফায় গুরুত্বপূর্ণ রুশ নাগরিক ও সরকার-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। একই সময়ে দেশটি ছাড়তে শুরু করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। কয়েকদিন আগেও রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ। ২০২৭ সাল থেকে রুশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইইউ। অন্যদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নতুন শিকার হয়েছে রুশ জ্বালানি তেল কোম্পানি রোসনেফট ও লুকঅয়েল। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য চাপ হিসেবে নতুন নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব পদক্ষেপ এখনই মস্কো পরিচালিত যুদ্ধে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না। কারণ অর্থনীতিতে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ভূমিকা অনেকাংশে কমিয়ে এনেছে রাশিয়া। আগে জ্বালানি খাত থেকে দেশটির বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি আসত। এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ২৫ শতাংশে। সরকারের যুদ্ধ ব্যয়ের বড় উৎস হয়ে উঠেছে রাজস্ব ও অভ্যন্তরীণ ঋণ।

ভ্লাদিস্লাভ ইনোজেমৎসেভ বলেন, ‘রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধের খরচ ডলার বা ইউয়ানে দেন না। রুবলে দেন, যা ছাপায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা আদায় করে কর বিভাগ।’

রাশিয়ার সার্বভৌম তহবিলে এখনো জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ সমপরিমাণ সঞ্চয় আছে, যা যুদ্ধ খরচে সহায়তা দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশটির বাজেট ঘাটতি জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ, যা এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের বিশ্লেষকরা বলছেন, পর্যাপ্ত রিজার্ভ ও অভ্যন্তরীণ ঋণ সুবিধা থাকায় রাশিয়া যুদ্ধ ব্যয় ‘আরো কয়েক বছর’ চালিয়ে নিতে পারবে।

ভ্লাদিস্লাভ ইনোজেমৎসেভ সতর্ক করে বলেন, ‘রফতানি কমলেও ২০২৭ সালের আগে পুতিনের যুদ্ধ পরিচালনার সামর্থ্যে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না।’

আরও